ইসলামে নারীদের চাকরির বিধান: নাজায়েজ নাকি জায়েজ | পর্দা, ক্যারিয়ার ও অধিকার | Byteful Believers
-
Rizwan Ahmed
আজকের দিনে চাকরি না থাকলে জীবন যেন অসম্পূর্ণ মনে হয়। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের ফলে চাকরির বাজার অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে। নতুন নতুন চাকরির সৃষ্টি হচ্ছে, আবার অনেক পুরাতন চাকরির বিলুপ্ত হচ্ছে। এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া সবার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নারীদের জন্য এই চ্যালেঞ্জের চাপ আরও বেশি। প্রতিষ্ঠিত হওয়া, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর নামে ক্যারিয়ারের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবন সামলাতে গিয়ে অনেকেই দেরিতে বিয়ে করছেন। যেখানে পুরুষদের মধ্যে চাকরি পাওয়ার সুযোগ সীমিত, সেখানে নারীরাও জব কম্পিটিশনে লড়ে যাচ্ছেন। ফলে একটি চাকরির জন্য লাখ লাখ পদপ্রার্থী ঝাপিয়ে পড়ছেন।
আসুন, এ বিষয়ে আলেম-এ-কেরাম কি কি মতামত রয়েছে সেটা নিয়ে আলোচনা করি।
নারীদের চাকরি করার ব্যাপারে ইসলামের রয়েছে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান। ইসলাম যেহেতু বিয়ের আগে বা পরে নারীদের ওপর আর্থিক কোনো দায়িত্ব অর্পণ করেনি, তাই মৌলিকভাবে তাদের অর্থ উপার্জনকে উৎসাহিতও করেনি। বিয়ের আগপযর্ন্ত সে বাবা, ভাই কিংবা চাচার নিয়ন্ত্রণে, বিয়ের পর স্বামীর নিয়ন্ত্রণে আর শেষ জীবনে স্বামী মারা গেলে বা উপার্জনে অক্ষম হয়ে পড়লে নিজের সন্তানের নিয়ন্ত্রণে। এদের কেউই না থাকলে নিজের অন্য কোনো সামর্থ্যবান মাহরাম আত্মীয়ের নিয়ন্ত্রণে। দায়িত্ব নেওয়ার মতো কোনো আত্মীয় না থাকলে সেক্ষেত্রে তার দায়িত্ব সোজা চলে যাবে ইসলামী খলিফার। তিনি সে নারীর সকল ব্যয়ভার বাইতুল মাল বা রাস্ট্রীয় কোষাগার থেকে বহন করবেন। মোট কথা সর্বাবস্থায়ই ইসলাম নারীদের আর্থিক দায়িত্ব তার নিজের ওপর নয় বরং অন্যের ওপর দিয়েছে। তাই বৈধ পন্থায় হলেও নারীদের অর্থ উপার্জনকে ইসলাম উৎসাহিত করেনি।
বৈধ পন্থায় হলে স্বাভাবিক অবস্থায় নারীদের অর্থ উপার্জনে যদিও শরিয়তের নিষেধ নেই, তারপরেও নানা রকম ফিতনার আশংকায় এ থেকে তাদের দূরে থাকাই ভালো ও নিরাপদ। এখানে বৈধ পন্থা বলতে, তার কর্ম বা ব্যবসা হালাল হওয়া, এতে কোনোরূপ পর্দার লঙ্ঘন না হওয়া, সালাত-সিয়ামসহ কোনো ইবাদত পালনে ব্যাঘাত না ঘটে, গাইরে মাহরাম পুরুষদের সাথে ফ্রি-মিক্সিং এ না থাকা, স্বামী সন্তান বা পরিবারের অন্য কারো অধিকার খর্ব না হওয়া ইত্যাদি।
যদি কোনো কাজ বা ব্যবসা করতে গিয়ে এসবের কোনোটির উপস্থিতি থাকে তাহলে তার জন্য সেটার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন হালাল হবে না। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, বর্তমান সময়ে আমাদের মুসলিম নারীরা স্বামী-সংসার ফেলে যেভাবে চাকরি করছে, এর বেশিরভাগই হারাম। এটা মূলত ইসলামী কালচার নয়, এটা আমদানি হয়েছে পশ্চিমা পুঁজিবাদী ধারণা ও তাদের সমাজ থেকে। “বেশি করে অর্থ উপার্জন করো, আর জীবনটাকে আরো মজা করে উপভোগ করো” এমন ভোগবাদি শ্লোগানই নারীদের চাকরিতে আসার প্রধানতম কারণ। গাড়ি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, উন্নত ফার্নিচার, সামাজিক পাওয়ার, উজ্জ্বল ক্যারিয়ার এসবই হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের অধিকাংশ নারীর স্বপ্ন। এটাকেই তারা প্রয়োজন ও অত্যাবশ্যক বলে অভিহিত করছে। অথচ ইসলাম কখনো এটাকে আবশ্যকতার গন্ডিতে অন্তর্ভুক্ত করেনি।
তবে হ্যা, নারীদের কখনো যে অর্থের প্রয়োজন হয় না, তাও কিন্তু নয়। এটা ঠিক যে, তাদের জীবনেও কখনো এমন পরিস্থিতি আসতে পারে। ইসলাম এ বিষয়টিরও খেয়াল রেখেছে। আসলেই যদি জীবনের তাগিদে কোনো নারীর কখনো অর্থের প্রয়োজন পড়ে; অথচ যে তার দায়িত্ব বহন করবে তার বাবা, স্বামী, সন্তান, আত্মীয়স্বজন কিংবা এমন কোনো পাড়া-প্রতিবেশী বা আত্মীয় না থাকে, তাহলে ইসলাম তাকে অর্থ উপার্জনের অনুমতি দেয়। এক্ষেত্রে অপরের নিকট হাত না তুলে তাকে হালাল কাজকর্ম কিংবা ব্যবসা করতে উৎসাহিত করে। ইসলামী খিলাফত থাকলে তো তার উপার্জনেরই দরকার পড়ত না, যেমনটা আগে বলেছিলাম। কারণ খলিফা বাইতুল মাল বা রাস্ট্রীয় কোষাগার থেকে তার যাবতীয় ভরণপোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করতেন। কিন্তু বর্তমানে যেহেতু খিলাফত-ব্যবস্থা নেই, তাই স্বামী-সন্তান বা সামর্থ্যবান আত্মীয়-প্রতিবেশির অবর্তমানে তাকেই উপার্জন করতে হবে। ইসলাম এটাকে নিষেধ করে না; বরং পরিষ্কারভাবেই তাকে উপার্জনের অনুমতি দেয়। তবে এই শর্তে যে, তাকে নিজের সাধ্যের মধ্যে ইসলামের সকল সীমারেখা মেনে চলার সবোর্চ্চ চেষ্টা করতে হবে। পর্দা লঙ্ঘনের বিষয় থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ একসাথে কাজ করা সহ ইসলাম-পরিপন্থী প্রতিটি বিষয় থেকে বেঁচে থাকতে হবে। হাতের কাজ, সেলাইয়ের কাজ, বাচ্চাদের পড়ানোসহ এমন অনেক ঘরোয়া কাজ আছে, যা ঘরে বসেই করা সম্ভব। বর্তমানে তো ঘরে বসে হালাল পন্থায় ফ্রিল্যান্সিং্যের মাধ্যমেও অনেক উপার্জন করা যায়। তাই জীবিকার নামে বর্তমানে নারীদের ঘরের বাইরে গিয়ে পুরুষদের সাথে মিলেমিশে চাকরি করতে চাওয়া মূলত এক ধরনের বিলাসিতা। একান্ত প্রয়োজন ও বাধ্য না হলে শরিয়ত কখনো এটার অনুমতি দেয় না।
মোট কথা, পুরুষদের সাথে অফিসে গিয়ে কাজ করার মতো বাধ্যবাধকতা নারীদের হয় না বললেই চলে। তাই নারীদের ঘর থেকে একাকী বের হয়ে পুরুষদের সাথে মিলেমিশে চাকরি করার বিষয়টি কখনো ইসলামে অনুমোদনযোগ্য হতে পারে না। শারয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে নারীদের জীবনে এরকম প্রয়োজন ও বাধ্যবাধকতা হয়তো ১%-ও হবে না। তবে আসলেই যদি কোনো নারীর এমন প্রয়োজন হয়ে পড়ে, যেখানে এভাবে চাকরি ছাড়া তার আর কোনোই উপায় নেই এবং এভাবে চাকরি না করলে তার জীবনযাত্রা অসম্ভব হয়ে পড়ে তাহলে বিজ্ঞ কোনো আলিমের কাছে সব অবস্থা খুলে বললে তিনি হয়তো সার্বিক পরিস্থিতি যাচাই করে তাকে সাময়িক সময়ের জন্য অনুমতি দিতে পারেন। কিন্তু এটা সাধারণ অবস্থার মাসআলা নয় এবং কোনো স্থায়ী সমাধানও নয়। সাধারণত নারীদের জীবনে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় না বললেই চলে। তাই সার্বজনীনভাবে ফাতওয়া এটাই থাকবে যে, শরিয়তের বিধান লঙ্ঘন করে গাইরে মাহরাম পুরুষদের সাথে মিলেমিশে নারীদের চাকরি করা বৈধ নয়। জীবনের তাগিদে অর্থ উপার্জনের প্রয়োজন পড়লে ঘরোয়াভাবেই উপার্জনের চেষ্টা করতে হবে; যেমনটি বর্তমানে অনেক দ্বীনদার নারীই করে থাকেন, যা অত্যন্ত এপ্রিশিয়েটিভ। আর একান্ত বাইরে বের হওয়ার প্রয়োজন হলে সেক্ষেত্রে পর্দা ও নিরাপত্তার সাথে বের হয়ে ইসলামের সকল বিধান মেনেই সকল কাজ সমাধা করবে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয়। তাই এখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো, যে এ-সম্পর্কিত সকল সংশয় ও সন্দেহ দূর হয়ে যায়।
আশা করি এই আলোচনাটুকু বুঝতে পেরেছেন কিনা কমেন্টে জানাবেন।
এই ভিডিওতে কন্ঠ আমার হলেও কথাগুলো “বিলিয়ন ডলার মুসলিম” বইটি থেকে অনুপ্রেরনিত হয়ে বলা। ইন শা আল্লাহ, সকলের উপকারে আসবে। পূর্বে অনেক আলেম-এ-দ্বীনরা এ বিষয়ে অলরেডি মতামত জানিয়েছেন। তারপরেও তাদের কথাগুলো যেন আরো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে তাই এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। সকলে দোয়া করবেন।
