নারী কি সত্যিই পুরুষের পাজরের হাড় থেকে সৃষ্টি? Ft. Mufti Rakibul Islam, Rizwan Ahmed | Halal Dizworld
-
Rizwan Ahmed
নারী কি সত্যিই পুরুষের পাজরের হাড় থেকে সৃষ্টি?
ইসলামের আসল বক্তব্য – কুরআন, হাদীস, ইজমা, কিয়াস ও ক্লাসিক্যাল উলামার আলোকে
অনেকের ধারণা, “হাওয়া (আ) শুধু নয়, আজ পর্যন্ত প্রতিটি নারী তার স্বামীর পাজরের হাড় থেকে সৃষ্টি।”… এই কথা অনেক বছর ধরে প্রচলিত হলেও, ইসলামের মূল উৎসগুলো কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস এই দাবিকে সমর্থন করে না। আসুন দেখি ইসলাম কী বলে। চলুন বিষয়টাকে পরিপূর্ণভাবে, নির্ভুল রেফারেন্সসহ বুঝে নিই।
.
১.০ কুরআনের বক্তব্যঃ
১.১ হাওয়া (আ.)-এর সৃষ্টিঃ
আল্লাহ বলেন: “তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন একক ব্যক্তি থেকে, এবং তার থেকেই সৃষ্টি করেছেন তার সঙ্গিনী।” ~ সূরা আন-নিসা ০৪:০১… এখানে বলা হয়েছে, হাওয়া (আ.) আদম (আ.) থেকে সৃষ্টি। কিন্তু কোথা থেকে? পাজর না অন্য অংশ তা কুরআন উল্লেখ করেনি।
.
১.২ মানবজাতির বাকিদের সৃষ্টি কীভাবে হয়?
কুরআনে বারবার পুনরাবৃত্ত সত্য:
- “তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন নুফতা থেকে।” ~ সূরা নাহল ১৬:০৪
- “আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর আমি তাকে নুফতা (শুক্রবিন্দু) রূপে এক সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি। এরপর আমি শুক্রবিন্দুকে আলাকাহ (জমাট রক্ত) রূপে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর জমাট রক্তকে মাংসপিন্ডে পরিণত করেছি, এরপর সেই মাংসপিন্ড থেকে অস্থি সৃষ্টি করেছি, অতঃপর অস্থিকে মাংস দ্বারা আবৃত করেছি, অবশেষে তাকে নতুন রূপে দাঁড় করিয়েছি। নিপুণতম সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কত কল্যাণময়।” ~ সূরা মুমিনুন ২৩:১২–১৪
- “হে মানব, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিতি হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।” ~ সূরা হুজুরাত ৪৯:১৩
.
➡️ স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত: হাওয়া (আ.)-এর পরে মানবজাতি বংশানুক্রমে জন্ম নিয়েছে নুফতা / শুক্রবিন্দু / ডিম্বাণুর প্রক্রিয়ায়, স্বামীর পাজরের হাড় দিয়ে নয়।
২. হাদীসের বক্তব্য
২.১ “পাজরের হাড়” হাদীস
রাসূল ﷺ বলেছেন: “নারীকে পাজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” সহীহ বুখারি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৩০৯৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩৩৩১, হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih); সহীহ মুসলিম, হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৩৫৩৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৪৬৮।
অনেকেই ভুলভাবে ধরে নেন যে, এটা সব নারীর জন্য প্রযোজ্য।
কিন্তু শেখ ইবন হজর আসকালানি (ফাতহুল বারী, হাদীস ব্যাখ্যা) স্পষ্ট বলেন, “এই হাদীস হাওয়া (আ.) সম্পর্কেই, অন্য নারীদের ক্ষেত্রে নয়। এখানে “পাজরের হাড়” ছব্দটা “উপমা” হিসেবে বলা হয়েছে, যা নারীর কোমলতা বোঝানোর জন্য।”
ইমাম নববী (ব্যাখ্যা: শরহ মুসলিম) আরও ব্যাখ্যা করেন, “নারীর স্বভাব পুরুষের মতো কঠিন নয়। তাকে জোর করে ‘সোজা’ করতে গেলে ভেঙে যাবে। অর্থাৎ সম্পর্ক ভেঙে যাবে।”
.
২.২ পরবর্তী নারীদের সৃষ্টির বিষয়ে কোনো হাদীস আছে কি?
না, একটি হাদীসও নেই যা বলে, “প্রত্যেক নারী তার স্বামীর পাজর থেকে সৃষ্টি।” এটা পরিষ্কারভাবে গল্প, ধর্ম নয়।
৩.০ – ইজমা (উলামাদের সম্মিলিত মত)
৩.১ – উলামাদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত:
- “হাওয়া (আ.) আদম (আ.) থেকে সৃষ্টি” এতে ইজমা আছে।
- আদম-হাওয়ার পর সকল পুরুষ-নারী জন্মায় বংশানুক্রমে।
- “প্রত্যেক নারী তার স্বামীর পাজর থেকে সৃষ্টি” এটা নিয়ে কোনো আলেম কখনো বলেননি।
.
৩.২ – তাফসিরকার ও হাদীস বিশারদদের ব্যাখ্যা,
তাফসির ইবন কাসির (সূরা নিসা ৪:১ ব্যাখ্যা)ঃ “আল্লাহ হাওয়াকে আদমের দেহ থেকে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তাদের দুজনের মাধ্যমে মানবজাতি সৃষ্টি করেছেন।”
তাফসির তাবারীঃ ইবন জারির তাবারী বলেন, “হাওয়া (আ.) ব্যতীত আর কাউকে আদমের দেহ থেকে সৃষ্টি করা হয়নি। পরবর্তী মানবজাতি এসেছে নুফতা থেকে।”
তাফসির কুরতুবিঃ কুরতুবি বলেন, “হাদীসের পাজরের হাড় হাওয়া (আ.) সম্পর্কিত, এবং তা নিয়ে অযথা তর্কের প্রয়োজন নেই। অন্য নারীদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়।”
৪. কিয়াস (ইসলামি যুক্তিবিদ্যা ও শরীয়তচিন্তা)
যদি প্রতিটি নারী তার স্বামীর হাড় থেকে সৃষ্টি হতো, তাহলে:
- একজন নারী জন্মের সময় তো স্বামীহীন, সে তাহলে কার হাড় থেকে সৃষ্টি?
- যেসব নারী বিয়েই করেনি, তাদের সৃষ্টি কীভাবে হলো?
- একজন নারী যদি একাধিকবার বিয়ে করে, তাহলে তার সৃষ্টির উৎস কোন স্বামী ধরা হবে?
- স্বামীর মৃত্যু হলে কি স্ত্রীর অস্তিত্বের ভিত্তি নষ্ট হয়ে যায়?
- আর যদি স্ত্রী স্বামীর হাড় থেকে সৃষ্টি হতো, তাহলে সন্তান জন্মের ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা কুরআনে এত গুরুত্ব দিয়ে কেন বলা হলো?
.
এই প্রশ্নগুলোর কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর নেই। তাই কিয়াসের দৃষ্টিতে স্পষ্ট,
“সব নারী স্বামীর পাজরের হাড় থেকে সৃষ্টি”- এই ধারণা অযৌক্তিক, বাস্তববিরোধী এবং শরীয়তের মৌলিক নীতির সাথে সাংঘর্ষিক।
.
৫.০ – ইসলামের মূল শিক্ষাঃ নারী কি কম মর্যাদার?
ইসলাম কখনো নারীকে পুরুষের “হাড়ের টুকরা” হিসেবে মূল্যায়ন করেনি।
বরং আল্লাহ বলেন:
- “তোমরা একে অন্যের পোশাক।” ~ সূরা বাকারা ০২:১৮৭
- “আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে।” ~ সূরা হুজুরাত ৪৯:১৩
- “আমি তোমাদের মধ্যে কাউকে অযথা অপমান করবো না, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে।” ~ সূরা আলে ইমরান ০৩:১৯৫
➡️ নারী-পুরুষ উভয়েই আল্লাহর দৃষ্টিতে সম্মানিত, সমান মূল্যবান, দুজনের দায়িত্ব-ভূমিকা ভিন্ন, কিন্তু মর্যাদা নয়।
.
৬.০ – আধুনিক পরিবার-মনোবিজ্ঞানের আলোকে ব্যাখ্যা
একজন ফ্যামিলি কাউন্সিলরের দৃষ্টিতে “পাজরের হাড়” হাদীসের শিক্ষাটি:
- সম্পর্ককে শক্তি দিয়ে নয়, কোমলতা দিয়ে গড়া যায়।
- নারীর স্বভাব আল্লাহর দেয়া ভিন্ন এটাকে সম্মান করতে হয়।
- জোর করে নিজের কাঠামোতে ঢোকাতে গেলে সম্পর্ক ভেঙে যায়।
হাদীসটি বৈবাহিক জীবনের আচরণবিধি, বায়োলজিক্যাল ক্রিয়েশন নয়।
ইসলাম নারীকে কখনো “পুরুষের রিজার্ভ পার্টস” হিসেবে দেখায়নি। বরং নারী-পুরুষ দুজনকেই এক আত্মা, এক উৎস, এক মর্যাদার মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছে। এই আলোকে “সব নারী স্বামীর পাজরের হাড় থেকে সৃষ্টি”
এটা ধর্ম নয়, বরং লোকমুখে ছড়ানো গল্প।
ইসলামের মূল উৎসগুলো এই দাবিকে সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে।
আর্টিকেলের সারাংশ
ইসলাম স্পষ্টভাবে বলে, হাওয়া (আ.) আদম (আ.) থেকে সৃষ্টি হয়েছেন, কিন্তু পরবর্তী সব নারী জন্মেছেন “স্বাভাবিকভাবে নুফতা বা বীজ থেকে”, কোনো নারীর সৃষ্টি তার স্বামীর পাজরের হাড় থেকে হয়নি। হাদীসে “পাজরের হাড়” কথাটি এসেছে কেবল হাওয়া (আ.)-এর জন্য এবং এটি “উপমা” হিসেবে, নারীর কোমলতা বোঝানোর জন্য, বাস্তব জন্মের নির্দেশ নয় (সহিহ বুখারি ৩৩৩১, সহিহ মুসলিম ১৪৬৮, তাফসির ইবন কাসির)।
ফলত, “সব নারী স্বামীর হাড় থেকে সৃষ্টি”- এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইসলামে নারী-পুরুষ দুজনই সমান মর্যাদার এবং একে অপরের পরিপূরক (সূরা বাকারা ০২:১৮৭, সূরা নিসা ০৪:০১)। পাজরের হাড়ের বিষয়টি সম্পর্কের শিক্ষণমূলক উপমা মাত্র, তাই নারীকে কখনো কম মর্যাদার হিসেবে দেখার কোনো ভিত্তি নেই।
