সফটওয়্যার পাইরেসি কি হালাল নাকি হারাম? | Full Islamic Discussion | In Bangla – By Rizwan Ahmed & Mufti Rakibul Islam
-
Rizwan Ahmed
অনেকেরই হয়তো বিশ্বাস হবে না যে, সফটওয়্যারের মতো কোনো অদৃশ্য জিনিস যা দেখা যায় না বা ছোঁয়া যায় না, কিন্তু কাজে কর্মে অনেক হেল্পফুল, এমন জিনিস টাকা দিয়ে কিনতে হয়। কম্পিউটারে আমরা আমাদের পার্সোনাল কিংবা প্রফেশনাল কাজে বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যার অনলাইন থেকে ডাউনলোড করে ব্যবহার করে থাকি, যেগুলোর মধ্যে থেকে কিছু ফ্রিতে পাওয়া যায় আবার কিছু টাকা দিয়ে কিনে নিতে হয়। আমরা ফ্রি সফটওয়্যার তো সহজেই বিনা ঝামেলায় ডাউনলোড ও ব্যবহার করতে পারি, কিন্তু পেইড সফটওয়্যারগুলো আকাশ ছোঁয়া দাম ও বিদেশি কারেন্সিতে পারচেস বা ক্রয় করতে হয় বলে আমরা তা ব্যবহার করতে পারি না।
আবার, এমন কিছু সফটওয়্যার আছে যা সামান্য কয়েকদিন যেমন, ৭ দিন বা ১৫ দিন কিংবা ১ মাস সময়ের জন্য ফ্রিতে ট্রায়াল ভার্শনে ব্যবহার করার সুযোগ পাই। এর পর মেয়াদ শেষ হলেই আমাদেরকে সফটওয়্যারটি পারচেস করতে বলা হয়। তখন আমাদের মতো মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের পক্ষে সম্ভব না হবার কারণে আমাদের ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও বা এমন ঝামেলা থেকে মুক্তি পাবার জন্য সেই পেইড সফটওয়্যারগুলোর ক্র্যাক কিংবা পোর্টেবল ভার্শন ডাউনলোড করে নিতে হয়। যা আসলেই খুবই রিস্কি। কারণ আমরা এর কারণে যখন কোনো খুবই ট্রাস্টেড সাইট থেকে পেইড সফটওয়্যারগুলো ডাউনলোড করে নিচ্ছি, সেটা যে ভাইরাস-মালওয়্যার ফ্রি হবে সেটার গারেন্টি কেউই দেয় না।
এখন প্রশ্ন আসে, আমরা এমন পেইড সফটওয়্যারগুলোকে ক্র্যাক এর মাধ্যমে ডাউনলোড করছি সেটা সম্পর্কে ইসলাম কি বলে সেটা কি জায়েজ নাকি না জায়েজ? এ সম্পর্কে ইসলাম কি বলে সেটা আমরা এই আর্টিকেলে জানবো।
এই আর্টিকেলে “পাইরেটেড সফটওয়্যার ব্যবহার করা জায়েজ নাকি নাজায়েজ”-এ সম্পর্কে সবদিক থেকে ও সকল যুক্তিতর্ক এবং আলেম-মুফতিদের দেয়া মতামত বা ফতওয়া সামনে রেখে পুরো কেস স্টাডি করবো। ইন শা আল্লাহ্। পুরো আলোচনাটি পড়ুন, বুঝুন ও আপনার সকল কনফিউশন ক্লিয়ার করুন।
তো কথা না বাড়িয়ে আলোচনা শুরু করি।
বিশ্বের অনেক গুলো পেইড সফটওয়্যার আছে, যেগুলোর অধিকাংশই আমরা ক্র্যাক ভার্শন ব্যবহার করে থাকি, সেগুলোর মধ্যে থেকে এই আর্টিকেলের পুরো আলোচনাটুকু বুঝার জন্য শুধু মাইক্রসফট এর সফটওয়্যারগুলোর কথা বলি।
আমরা যখন পিসি বিল্ড করতে যাই তখন অধিকাংশ মানুষই পিসি বিল্ড করার পর শুধু মাত্র উইন্ডোজ ইন্সটল করার জন্য আলাদা করে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা বাজেট রাখে না, এই কারণে যে এই পেইড অপারেটিং সিস্টেম উইন্ডোজ এর ক্র্যাক ভার্শন পাওয়া যাচ্ছে, তখন কেনই বা সেই বাজেটটুকু রাখবো? তখন আমরা না কিনেই যেখান কম্পিউটারের দোকান থেকে পিসি বিল্ড করছি, তারা বিনা খরচে ইন্সটল করে দিবে অথবা আমরা নিজেরাই অনলাইন থেকে ক্র্যাক ভার্শন ডাউনলোড করে ইন্সটল করে নিই। আর আমরা নিজেরা এইভাবে আলাদা করে উইন্ডোজ কিনার প্লান করা হয়না বলে আমরা অধিকাংশই সেই উইন্ডোজ পারচেস করি না।
এইদিকে ন্যাশন মাস্টার ডট কম নামের একটি ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, যে ২০০৭ সালের দিকে পুরো বিশ্বের সফটওয়্যার পাইরেসি রেটের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে টপ-৫ এর মধ্যে কোনো এক অবস্থানে স্থান পেয়েছিল। আবার বাংলাদেশি ওয়েব পোর্টাল “দ্যা ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ডট কম ডট বিডি” থেকে জানা যায়, Asia pacific country-গুলোর মধ্যে থেকে বাংলাদেশের অবস্থা শীর্ষে রয়েছে। ২০২০ সালের দিকে পাইরেসি রেট ছিলো ৯০% এবং পরে তা কমে ৮৪% এবং পরে তা আরো কমতে কমতে ২০২২ সালে ৩১ জানুয়ারি এর আর্টিকেল অনুযায়ী পাইরেসি রেট নেমে ৩৭% এ এসেছে।
এখন প্রশ্ন আসে,
- আমাদের দেশে কেন এতো বেশি সফটওয়্যার পাইরেসি হচ্ছে?
- আমরা যারা এমন সব সফটওয়্যারের পাইরেসি করি, কেন আমাদের বিরুদ্ধে কোনো লিগাল একশন নেয়া হয়না বা আইনের আওতায় আনা হয়না? কেনই বা জেল-জরিমানা করা হয়না?
প্রথমে আসি “আমাদের দেশে কেন এতো বেশি সফটওয়্যার পাইরেসি হচ্ছে?”
এর সবচেয়ে বড় কারণ হল আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই, যারা ডেস্কটপ/ল্যাপটপ কম্পিউটার দিয়ে শুধু শিক্ষার্জন করতে চায় কিংবা প্রফেশনাল ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে চায় তারা কিন্তু মধ্যম আয়ের, নিম্ন-মধ্যম আয়ের এবং নিম্ন আয়ের মানুষ। বলতে গেলে তারা বেশির ভাগই মিডল ক্লাস ফ্যামিলি থেকে বিলং করে। এদিকে আপনি ভালো করে ইন্টারনেট ঘাটাঘাটি করেন তবে আপনি দেখতে পারবেন যে, বাংলাদেশে শুধু রিটেইলে উইন্ডোস ১০ প্রো-র প্রাইজ হচ্ছে 13500 Taka. (Source: L-Key/info)
এখন আপনি বলেন, আমাদের দেশের বেশির ভাগ কম্পিউটার ইউজার, যাদের পরিবারের শুধু মাসিক বেতনই হচ্ছে, ধরেন ১৫-২০ হাজার টাকা তারা কিভাবে এতো হাই প্রাইজের সফটওয়্যার ব্যবহার করতে চাইবে? যারা এমনটা চায় সেটা শুধুমাত্র বিলাসী মনোভাব ছাড়া আর কিছুই না।
এখন আসি ২য় প্রশ্নে, আমরা যারা এমন সব সফটওয়্যারের পাইরেসি করি, কেন আমাদের বিরুদ্ধে কোনো লিগাল একশন নেয়া হয়না বা আইনের আওতায় আনা হয়না? কেনই বা জেল-জরিমানা করা হয়না?
হ্যা, মেনে নেয়া যায় যে, মিডল ক্লাস ফ্যামিলি থেকে বিলং করা সেই কম্পিউটার ইউজার, এমন পেইড সফটওয়্যার কিনা এফোর্ড করতে পারে না। কিন্তু এটা তো আমাদের দেশের কপিরাইট আইন ২০০০ অনুযায়ী, যেটা পরবর্তিতে ২০০৬ এবং ২০১০ সালে amend বা সংশোধন হয়েছে, সেটার অনুযায়ী এই পাইরেসির কাজটা কিন্তু অপরাধ বা ইল্লিগাল।
এখন কথা হলো, কেন আমাদের বিরুদ্ধে বা যারা সেই সব সফটওয়্যারে পাইরেটেড বা ক্র্যাক ভার্শন ব্যাবহার করে তাদের বিরুদ্ধে কোনো লিগাল একশন নেয়া হয়না বা আইনের আওতায় আনা হয়না? বা কেনই বা কোনো জেল-জরিমানা করা হয়না?
একটা জিনিস খেয়াল করেন, আমরা যারা কোনো কোম্পানির সফটওয়্যার যদি আমরা সেটার ক্রাক ভার্শন ব্যবহার করি, তাহলে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অধিকার কিন্তু সেই কোম্পানিএর আছে। মানে আগের উদাহরণ সাপেক্ষে, যদি আমরা ইউন্ডোজের ক্রাক ভার্শন ব্যবহার করি তাহলে আমাদের বিরুদ্ধে একশন নেয়ার অধিকার কিন্তু মাইক্রোসফটের আছে। তার পরেও মাইক্রোসফট তা বেশির ভাগ সময় করছে না। হয়তো বা কোনো বিজনেস অর্গনাইজেশন লেভেলের বা কোনো কোম্পানি লেভেলের দিকে যদি খুবই বাল্ক আকারের পাইরেসি হবার ঘটনা ঘটলে তখন সেটার ব্যবস্থা মাইক্রোসফট নিয়ে থাকে। কিন্তু আমার আপনার সবার মতো যারা ইন্ডিভিজুয়াল পার্সন অথবা যারা সেই বিজনেস বা কোম্পানি লেভেলের না, এমন পাবলিকদের বিরুদ্ধে মাইক্রোসফট অন্য কোনো সফটওয়্যার কোম্পানি কখনোই এমন আইনগত ব্যবস্থা নেয় না।
এখন কথা হলো, কেন? এর অন্যতম কারণ হচ্ছে সংক্ষেপে বলতে গেলে বিজনেস পপুলারিটি বা ব্যবসায়ীক জনপ্রিয়তা।
হয়তো অনেকেই জানেন যে, ১৯৯০’s এর দিকে একটি অপারেটিং সিস্টেম রিলিজ হয়েছে, যেটার নাম হচ্ছে লিনাক্স, আর সেটা ১০০% ফ্রি। সো, যদি মাইক্রোসফট বা বাকি সফটওয়্যার পাইরেসি এন্টি পাইরেসিমুক্ত ব্যবস্থা নেয় বা আমার-আপনার আমাদের সবার মতো মানুষদের বিরুদ্ধে লিগাল একশন নেয় বা জেল-জরিমানার মতো দন্ডে দন্ডিত করে তবে তাহলে আমাদের মতো ইউজাররা উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের ব্যবহার বন্ধ করে দিয়ে লিনাক্সের দিকে দ্রুত গতিতে ছুটে যাবে। যার ফলে লিনাক্সের জনপ্রিয়তা উইন্ডোজের থেকে অনেক অনেক বেশি বেড়ে যাবে। তখন উইন্ডোজের চাইতে লিনাক্সের ইউজার বেড়ে যাওয়ার কারণে ডেভেলপমেন্টও বেশি হতো। এখন যে মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ ১১ নামের অপারেটিং সিস্টেম রিলিজ হয়েছে, তা আর কখনোই সম্ভব হতো না।
যদি মাইক্রোসফট তাদের এমন সব পাইরেট সফটওয়্যার ব্যবহারকারীদেরকে জেল-জরিমানা করে তাহলে মাইক্রোসফটের জনপ্রিয়তা একেবারে শুন্যের কোঠায় নেমে যাবে। যার ফলে তাদের বার্ষিক ইঙ্কাম একেবারেই ক্ষতির স্তরে চলে আসবে। শুধুমাত্র এই কারণে মাইক্রোসফটের জনপ্রিয়তা যাতে হাতছাড়া না হয়ে যায় সেই কারণে মাইক্রোসফটt তাদের কপিরাইট পলিসিতে শুধুমাত্র ফ্রি ফর পার্সোনাল ইউজ করেছে, তবে ফ্রি ফর কমার্শিয়াল ইউজ এখনোও অব্যহত আছে।
আর যারা এসব উইন্ডোজকে কপিরাইট আইনের ভাষায় কমার্শিয়াল ইউজের জন্য ব্যবহার করবে বা যারা টাকা দিয়ে না কিনে যদি পাইরেসি করে ডাউনলোড করে এবং সেটা কারোর কাছে নগদ টাকায় বিক্রয় করে, তাহলে সেটাকে অপরাধ হিসেবে গন্য করা হবে। এবং এর কারণে মাইক্রোসফট তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। আর এমনটা মাইক্রোসফট তার নিজের ওয়েবসাইট প্রকাশ করেছে।
এ ব্যাপারটা শুধু উইন্ডোজের ব্যাপারে মাইক্রসফট এর ক্ষেত্রে না, এইটা অন্যান্য সকল সফটওয়্যারে টেক বা সফটওয়্যার কোম্পানিরাও এভাবে করে থাকে।
আর একটা খুবই জনপ্রিয় এবং বহুল ব্যবহৃত সফটওয়্যারের কোম্পানি হচ্ছে Adobe. এবং Adobe-এর সফটওয়্যারগুলোর Monthly Subscription খুবই ব্য্যবহুল। এমনকি আমি রিজওয়ান আহমেদ, নিজেও afford করতে পারবো না, এটা বাংলাদেশের কারোর ক্ষেত্রেই afford করা সম্ভব না। এই চ্যানেলের অন্যতম আলোচনার টপিক গ্রাফিক ডিজাইনের দিকে তাকান, গ্রাফিক ডিজাইনের জন্য অন্যতম জনপ্রিয় Software Adobe Photoshop CC 2019 এর রিটেইলে প্রাইজ হচ্ছে ৪৫৩১০ টাকা, Adobe Illustrator CC 2019 এর রিটেইলে প্রাইজ হচ্ছে ৪৫৩১০ টাকা। আবার Adobe Creative Cloud All Apps এর প্রাইজ হচ্ছে ১১০০০০ টাকা, তাও আবার ১০% ছাড়ে।
এখন মাইক্রোসফট ও অন্যান্য কোম্পানির মতো Adobe-ও জানে যে, মানুষ তাদের বানানো সফটওয়্যারগুলকে বিভিন্ন ভাবে Edit করে, সফটওয়্যারের Code-গুলো Change করে করে ফ্রিতে নিজেদের মধ্যে দেয়া-নেয়া ও ব্যবহার করছে। তার পরেও তাদের কর্ত্রিপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের Legal Action নেয়া হচ্ছে না। কারণ যখন থেকে তারা Anti Piracy করার সকল ধরনের Action হাতে নিবে তখন থেকে তাদের জনপ্রিয়তা একেবারেই শুন্যের কোঠায় নেমে পড়বে। যার ফলে তাদের Yearly Income একেবারেই ক্ষতির স্তরে চলে আসবে। আবার তাদের Alternative অনেক গুলো ফ্রি Software এর আবিষ্কার ও ব্যবহার বেড়ে যাবে। এখন তো Already কয়েকটা আছে। যেমন Photoshop-এর Alternative হচ্ছে GIMP. আর Adobe-এর Software ব্যবহার করার percentage একেবারেই কমে যাবে। তাই তারা এ ব্যাপারে কোনো Action নিচ্ছে না।
তো আবার একটু সর্ট করে বলে দিই, যদি pirated software এর company গুলো কোনো ধরনের legal action নেয় তাহলে তাদের জনপ্রিয়তা একেবারেই শেষ হয়ে যাবে। যার কারনে এগুলোর alternative হিসেবে অনেক software বের হয়ে যাবে। যার ফলে তাদের বাৎসরিক আয়ের হার একেবারেই ক্ষতির স্তরে দাঁড়াবে। আর এসব ঘটনার ভয়েই কোনো Company এমন লিগাল একশন নিচ্ছে না। আর এর জন্য তারা শুধু মাত্র তাদের Software-কে অঘোষিতভাবে Copyright License করেছে Free for Personal Use. আর যারা সেই Softwareকে Commercial কাজে ব্যবহার করতে চাইবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা সে Company নিবেই।
হয়তো বুঝেই গিয়েছেন, কেন এতো Piracy হবার পরেও কোনো ধরনের Legal Action নেয়া হয়না।
অর্থ্যাথ পূর্বের Case Study তে আমরা জানতেই পেরেছি যে, কোনো Software Company এমন পাইরেসিএর বিরুদ্ধে Legal Action না নেয়ার মূল কারণ হচ্ছে তাদের ব্যবসায়ীক স্বার্থ। তারা যদি Personal Use এর জন্য Software ব্যবহার করা এমন Public-এর বিরুদ্ধে জেল-জরিমানা করায় তবে তাতে তাদের সুনাম ও জনপ্রিয়তার ক্ষতি হবে। আর এতে তাদের বাথসরিক আয়ের হার পূর্বের তুলনায় কমে থাকবে। এবং পরবর্তিতে শুন্যের কোঠায় নেমে আসবে।
তাই সেসব Software Company-রা এসব ব্যাপারে মৌন সম্মতি থাকছে বলে সেই কোম্পানির পাইরেট বা ক্র্যাক ভার্শন ব্যবহার করা জায়েজ।
এখন আসি, এ সম্পর্কে ইসলাম কি বলে,
তো শুরুতেই বলে দিচ্ছি, অনেক আলেম-মুফতিগণ বিভিন্নভাবে যুক্তি দেখিয়ে তাদের মতামত দিয়েছেন। এই আর্টিকেলে আমি আমার মতামত দিব, এবং সেটা একজন মুফতি দ্বারাই ভেরিফাই করা। আর তার নাম হচ্ছে, মুফতি রাকিবুল ইসলাম, পি এইড ডি ইসলামী ল (মুফতী), হাটহাজারী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়৷ এর পাশাপাশি তিনি একজন মুহাদ্দিস, মাদরাসাতুল বানাত,কালামপুর, ধামরাই,ঢাকা আর প্রতিষ্ঠাতা, দারুল উলুম মাদানিয়া মাদরাসা। আবার তিনি ব্যবসা সম্পাদক, মুনাজ্জমাতুল আসদিকা সমবায় সমিতি আর শিক্ষা সমন্বয়ক, আল মানার শিক্ষা পরিবার।
তো উপরের কেস স্টাডি থেকে আমরা সফটওয়্যারের ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এর দিক থেকে ২ধরনের উদ্দেশ্যে দেখতে পাই।
- ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য
- ব্যবসায়ীক উদ্দেশ্য
প্রথমে আসি, ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য
পাইরেসি করা সফটওয়্যারটি নিজের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা কিংবা বিক্রয় বা পরিবেশন না করে নিজেদের ব্যবস্যায়িক বা আর্থিক কাজে লাগানো। এ প্রকারের ব্যবহারের ক্ষেত্রে যদি কপিরাইট অধিকারীর মৌন সম্মতি থাকে, তাহলে তা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মৌন সম্মতির পাশাপাশি যদি জেনুইনটি কেনার মোটেও সামর্থ্য না থাকে তাহলে মুফতিগণ এর ব্যবহার জায়েয বলে থাকেন। (ফাতওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ fatwa ID : 903-917/N=8/1435-U)
অর্থ্যাথ পূর্বের কেস স্টাডিতে আমরা জানতেই পেরেছি যে, কোনো সফটওয়্যার কোম্পানি এমন পাইরেসির বিরুদ্ধে লিগাল একশন না নেয়ার মূল কারণ হচ্ছে তাদের ব্যবসায়ীক স্বার্থ। তারা যদি পার্সনাল ইউজ এর জন্য সফটওয়্যার ব্যবহার করা এমন পাব্লিকের বিরুদ্ধে জেল-জরিমানা করায় তবে তাতে তাদের সুনাম ও জনপ্রিয়তার ক্ষতি হবে। আর এতে তাদের বাথসরিক আয়ের হার পূর্বের তুলনায় কমে থাকবে। এবং পরবর্তিতে শুন্য(০) -এর কোঠায় নেমে আসবে। তাই সেসব সফটওয়্যার কোম্পানিরা এসব ব্যাপারে মৌন সম্মতি থাকছে বলে সেই কোম্পানির পাইরেট বা ক্র্যাক ভার্শন ব্যবহার করা জায়েজ।
এরপর আসি, ব্যবসায়ীক উদ্দেশ্য
ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে তথা নিজে লাভবান হওয়ার নিয়তে পাইরেটেড সফটওয়্যার বিক্রয় ও পরিবেশন করা। এটা নাজায়েয। কেননা, এর দ্বারা নির্মাতা বা আবিস্কারকের লাভের অধিকারকে হরণ করা হয়।
আর ক্ষতি সাধন সম্পর্কিত হাদীসে এসেছে,
সাহাবি হযরত আবু সাইড খুদরী (রাদিঃ)-এর সূত্রে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “ক্ষতি করাও যাবে, ক্ষতি সহ্যও করা যাবে না। যে অন্যের ক্ষতি করলো আল্লাহ তার ক্ষতি করবেন এবং যে তার সঙ্গে শত্রুতা করবে আল্লাহ তাকে শাস্তি দেবেন।” – সুনানে দারাকুতনি, হাদিস নংঃ ৩০৭৯
আলোচ্য হাদিসে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) মুমিনদের সর্বপ্রকার ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। এর দ্বারা বুঝা যায়, ‘ক্ষতি’ প্রতিহত করা ইসলামের মূলনীতি। সে নিজেকে যেমন ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে, তেমনি অন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকবে।
হাদিসের ব্যাখ্যাকার মোল্লা আলী কারি (রহ.) বলেন, ‘এই কথা স্পষ্ট যে, শারীরিক, আর্থিক, পার্থিব ও পরকালীন সব ধরনের ক্ষতি এই হাদিসের অন্তর্ভুক্ত।’-মিরকাতুল মাফাতিহ: ৮/৩১৫৬
এই হাদিসকে মূলনীতি ধরে ইসলামি স্কলাররা বলেছেন, ক্ষতিকর ও হারাম কাজে লিপ্ত হয়ে নিজেকে ক্ষতির মধ্যে ফেলে দেওয়া হারাম। অন্যের ক্ষতি করা নিষিদ্ধ। জীবন, সম্পদ, পরিবার ও সম্ভ্রমসহ সব ধরনের ক্ষতিকর বিষয় পরিহারযোগ্য।
ইসলামি শরিয়তের সাধারণ বিধান হলো- ক্ষতিকর বিষয় নিষিদ্ধ। ক্ষতি হওয়ার আগে প্রতিহত করা এবং ক্ষতি হয়ে গেলে তা দূর করা। ইসলাম স্পষ্টভাবে নিজের ও অন্যের ক্ষতি করতে নিষেধ করেছে। যারা অন্যদের ক্ষতির মধ্যে ফেলে দেয় হাদিসে তাদের অভিশপ্ত বলা হয়েছে।
সাহাবি হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের ক্ষতিসাধন করে বা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে সে অভিশপ্ত।’ – সুনানে তিরমিজি: ১৯৪১
হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিসে ইরশাদ করেন, ‘যে অন্যের ক্ষতি করে আল্লাহ তার ক্ষতি করেন এবং যে অন্যের শত্রুতা করে আল্লাহ তাকে শাস্তি দেন।’ – সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৩৫;
সুতরাং, মুমিনের উচিত নিজেকে সকল দিক দিয়ে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা এবং অন্যকেও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা।
তাই বলতে পারা যায় যে, ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সফটওয়্যারের ক্র্যাক ভার্শন ব্যবহার করা জায়েজ, আর ব্যবসায়ীক উদ্যেশ্যে ব্যবহার করা না জায়েজ।
