ফ্রিল্যান্সারদের যাকাত আদায় সম্পর্কে কিছু কথা | Rizwan Ahmed | Mufti Rakibul Islam | Byteful Believer
-
Rizwan Ahmed
আমাদের দেশে প্রায় আনুমানিক ৬-৮ লাখ এর মতো ফ্রিল্যান্সার আছেন। এবং দিনে দিনে এর পরিমান বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে যারা দক্ষ ফ্রিল্যান্সার, তাদের প্রতি বছরে যাদের লাখ থেকে কোটি টাকা পরিমান ইনকাম। যদি মুসলিম ফ্রিল্যান্সারদের যাকাত দেয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট বিধান নিয়ে আলোচনা হলে দেশ ও সমাজের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে।
এই লিখাটি শুধু আমার Research এর ফসল মাত্র। যা আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান এর মাধ্যমে সাজিয়ে ঘুছিয়ে আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম। আমার এই Research যে ১০০% সঠিক হবেই হবে, সেটার Guarantee দেয়ার যোগ্যতা আমার নাই। তাই, অনুগ্রহ করে, মন্দ জাতীয় কথা বলা থেকে বিরত থাকবেন এবং আমার ইমান-আকীদা Related কোনো প্রশ্নবিদ্ধ তুলবেন না।
আমি যেহেতু কোনো আলেম না, তাই আমার বলা তথ্য থেকে সরে আসা বা না আসার কোনো প্রশ্নই উঠে না। তবে আমার কোনো তথ্য ভুল প্রমাণিত হলে, আমার সেই ভুল তথ্যের জন্য আমি আন্তরিকভাবে অগ্রিম ক্ষমাপ্রার্থী, এবং তা সংশোধন করার চেষ্টা করব। ইন শা আল্লাহ্।
আচ্ছা, যাই হোক,
বিসমিল্লাহ বলে শুরু করি…
যদিও অধিকাংশ হাইলি ইঙ্কামিং ও দক্ষ ফ্রিল্যান্সাররা এবং বাংলাদেশ সরকার দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নতির জন্য নিজ নিজ জায়গা থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তবে তা যথেষ্ট হচ্ছে না বলে আমি মনে করি। এখন প্রশ্ন আসে, কেন হাইলি ইঙ্কামিং ফ্রিল্যান্সারদের বাৎসরিক ইঙ্কামের উপর যাকাত দেয়া দরকারি? এটা জানতে হলে আগে সংক্ষিপ্তভাবে জেনে নেই ফ্রিল্যান্সিং ও যাকাত আসলে কি?
ফ্রিল্যান্সিং কি
বর্তমানে চাকরি বাজারের এতো খারাপ অবস্থা, যেখানে প্রত্যেক পদবির চেয়ে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে যার কারনে প্রতিযোগিতামূলক চাকরি বাজারে চাকরি পাওয়া খুবই সোনার হরিণের সমান অবস্থা। আর এদিকে স্বাধীনতা একেবারেই নেই।
আর ফ্রিল্যান্স হচ্ছে একটি অনলাইন ব্যবসায় যা ঘরে বসে যেকোনো স্কীলের উপর দক্ষতার সাথে কাজ করে প্রচুর পরিমাণ অর্থ উপার্জনের বিশাল সুযোগ রয়েছে। রয়েছে নিজের পছন্দের ক্লাইন্টের সাথে ও নিজের সুবিধাজনক সময়ে কাজ করার সুবিধা এবং লং-টার্মের স্ট্যাবিলিট আনার নিশ্চয়তা। বলতে গেলে ১০০% ফ্রিডম।
যাকাত কি
এদিকে যাকাতই এমন একটি ইসলামী বিধান যার মাধ্যমে কোনো দেশের জনগনের আর্থিক স্থিতিশীলতা আসে। এর বিধানের মাধ্যমে কোনো ধনী ব্যক্তির একবছরের জমা থাকা সম্পত্তির কিছু অংশ কোনো দরিদ্র ব্যক্তিকে দিলে তার আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে আসার সুযোগ পায়। যার মাধ্যমে দরিদ্র ব্যক্তি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হতে শুরু করে আর ধনী ব্যক্তির ধন পবিত্র হয়ে ওঠে।
যদি সেই দক্ষ ও হাইলি ইঙ্কামিং ফ্রিল্যান্সাররা যাকাত আদায় করেন তাহলে দেশ ও সমাজের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে। তাই আমি মনে করি, তাদের যাকাত বিধানের আওতায় আসা দরকার। তারা নিজেদের পারিবারিক আর্থিক-স্বচ্ছলতা উন্নত করলেও দেশ ও সমাজের আর্থিক উন্নয়নে ঠিকমতো গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারছে না।
এখন আসি কুরআন-হাদিসের আলোকে ফ্রিল্যান্সারদের যাকাত আদায়ের বিধান কি কি…
সম্পদের হিসাব পরিমানের বিধান
ফ্রিল্যান্সারদের সম্পদ অন্য সকলের সাধারন সম্পদের মতই। এক বছর অতিক্রান্ত হলে 40/1 হারে (৪০ ভাগের ১ভাগ) যাকাত দিবে হবে। অর্থ্যাৎ, তাদের সম্পত্তির ১ চন্দ্র বছর অতিক্রম করতে থাকলে প্রতি বছরে সেটার সাড়ে সাত তোলা সোনা (প্রায় ৯৫.৭৪৮ গ্রাম) আর রুপা ৫২.৫ তোলা (প্রায় ৬৭০.২৪ গ্রাম) বা সম পরিমাণ অর্থসম্পদ বা ব্যবসায়িক মালামাল থাকলে যাকাত দিতে হবে।
“সাহেবে নেসাব পরিমাণ (গচ্ছিত) সম্পদের ২.৫০ শতাংশ আল্লাহর নির্ধারিত ৮ টি খাতে যাকাত দিতে হয়।” – (আদ্দুররুল মুখতার, ২ খন্ড ,পৃষ্ঠা নং ৪৩৭)
যাকাত আদায়ের জন্য আপনার সাহেবী নেসাবের পরিমাণ কতো হবে তা নির্ণয় করা এখন অনেক সহজ হয়ে উঠেছে। এখন অনেক ওয়েবসাইট ও এন্ড্রোয়েড অ্যাপে এক ধরনের ক্যালকুলেটর ডিজাইন ও ডেভেলপ হয়েছে যার মাধ্যমে খুব সহজেই ক্যালকুলেট করে নেয়া যাচ্ছে। জাস্ট হাতেগোনা কয়েকটা অপশন পূরণ করেই আপনি পাচ্ছেন আপনার আদায়যোগ্য যাকাতে সাহেবী নেসাবের পরিমাণ। এমনকি দেশের জনপ্রিয় পেমেন্ট গেটওয়ে বিকাশ-নগদও তাদের নিজস্ব এ্যাপে যাকাত নির্ণয়ের জন্য ক্যালকুলেটর এর ফিচার যুক্ত করেছে।
যেসব সম্পদের যাকাত দিতে হবে
নিজের ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিষের (গাড়ী/বাড়ী/ফ্লাট/প্লট ক্রয়/নির্মাণ/পূননির্মান করলে) উপর যাকাত দিতে হবেনা। যদি ব্যবসায়ীক বা নিজস্ব ব্র্যান্ডের প্রয়োজনে ক্রয় করে তবে সেটার যাকাত ওয়াজিব হবে।
“যে সমস্ত বাড়ি শুধু ব্যবসার উদ্দেশ্যে অর্থাৎ ভাড়া ইত্যাদির জন্য নির্মাণ করা বা ক্রয় করা হয়েছে সে সমস্ত বাড়ির আয় এবং মোট (ক্রয় বা নির্মাণ )মূল্যের উপর যাকাত পরিশোধ করতে হবে । পক্ষান্তরে যে সমস্ত বাড়ি বসবাসের উদ্দেশ্যে তৈরি বা ক্রয় করা হয়েছে সে সমস্ত বাড়ির ক্রয় বা নির্মাণ মূল্যের উপর যাকাত আসবে না । তবে নিজে এক ফ্ল্যাটে থেকে বাকি অন্যান্য ফ্লাট যদি ভাড়া দেওয়া হয় তাহলে শুধু ভাড়ার টাকার উপর যাকাত ওয়াজিব হয়ে যাবে। (ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম খন্ড নং ৬ পৃষ্ঠা নং ১০)”
যে যে বিষয় দেখা দিলে যাকাত আদায় করতেই হবে
- ব্যবসায়ীক বা নিজস্ব ব্র্যান্ডের প্রয়োজনে কোনো রুম ভাড়া করলে যাকাত দেয়া লাগবে।
- যদি ব্র্যান্ড ব্যবসায়ীক স্বার্থের জন্য পিসি আপগ্রেড হলে সেটার জন্যও যাকাত দেয়া লাগবে। এমনকি একাধিক ডেস্কটপ-ল্যাপটপ এর বিল্ড করা বা পারচেস করার জন্য আলাদা আলাদা অনুপাতে যাকাত ওয়াজিব হবে।
- ব্যবসায়ীক স্বার্থে দুইটা ব্র্যান্ড এক হয়ে কাজ করলে উভয় ব্র্যান্ডকে যাকাত দেয়া লাগবে। তবে যে যত করে বিনিয়োগ করবে তত অনুপাতে যাকাত আদায় করতে হবে।
- যে কোন সমিতি, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, ব্যাংক-বীমা, ডিপিএস ইত্যাদিতে নিজ বা সন্তানের নামে সঞ্চয়কৃত সকল অর্থের উপর যাকাত আসবে। বছরান্তে সেগুলো হিসাব করে ভ্যালু অনুযায়ী যাকাত পরিশোধ করতে হবে। (ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া, খন্ড নং ১১)
যাদেরকে যাকাত দিতে হবে
এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন,
“যাকাত হল কেবল (১) ফকির, (২) অভাবগ্রস্থ বা মিসকীন, (৩) যাকাত আদায়ের জন্য নিযুক্ত কর্মচারী ও (৪) যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা (৫) দাস-মুক্তির জন্যে–(৬) ঋণ গ্রস্তদের জন্য, (৭) আল্লাহর পথে জেহাদকারীদের জন্যে এবং (৮) মুসাফিরদের জন্যে, এই হল আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”
–
(আত তাওবাহ্ – ৬০)
যে পদ্ধতিতে যাকাত দিতে হবে
যদিও অল্প সংখ্যক ফ্রিল্যান্সাররা যাকাত আদায় করছেন, তবে অধিকাংশই জানেন না যে “কোন কোন পদ্ধতি অনুসরন করে যাকাত আদায় করা উত্তম হবে?”
সাধারণত যাকাত সোনা-রূপা কিংবা সমপরিমান সম্পদ বিতরনের মাধ্যমে আদায় করা যায়। কিন্তু এ ছাড়াও আরো বিভিন্ন পদ্ধতিতে যাকাত আদায় করা যেতে পারে। যেমন,
- কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরীতে মূলধনের যোগান দিয়ে কিংবা আবশ্যকীয় যন্ত্রপাতির যোগান দিয়ে ইত্যাদি আরো বিভিন্ন উপায়ে যাকাত আদায় করা যায়।
- যাকাতের টাকা কোনো ফাউন্ডেশনকে দেয়া যাবে যারা সমাজকল্যাণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে। যারা আপনার পক্ষ হয়ে গরিব-অভাবগ্রস্থদেরকে উত্তম পদ্ধতিতে সহায়তামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে পৌছিয়ে দিবে।
- এমন কোনো মাদ্রাসা যেখানে এতিম ছাত্ররা অধ্যায়ন করে, তাদের আরো সহজতর জীবন যাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যাকাত প্রদান করা যেতে পারে।
- কোনো সমাজকল্যানভিত্তিক সংগঠন যারা দীর্ঘদিন ধরে পথশিশু ও বস্তি এলাকার শিশুদের জন্য বিনামূল্যে পাঠদান সহ বিভিন্ন ধরনের কল্যাণমূলক ব্যবস্থা সবসময় গ্রহণ করে থাকেন, যেমন শিক্ষা সামগ্রী বিতরণ, নৈতিক শিক্ষা প্রদান, স্বাস্থ্যগত সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিনোদন ইত্যাদি। এমন ধরনের সংগঠনদেরকে যাকাত এর টাকা প্রদান করা যাবে।
মূলকথা হলো, যাকাতের টাকা যেন দেশ ও সমাজ এর কল্যাণের স্বার্থে ব্যবহার হবে এমন বিভিন্ন ক্ষেত্রে ও উপায়ে যাকাত আদায় করতে হবে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে ইসলামের অন্যতম রুকন “যাকাত“-এর উপর আমল করার তৌফিক দান করুন।
